ঢাকা | বঙ্গাব্দ

গাজায় ফিলিস্তিনিদের হতাশা

ভিডিওতে আরো দেখা যায়, এক কিশোর বড় একটি হাঁড়ির ভেতরে হাত ঢুকিয়ে কিছু অবশিষ্ট ভাত কুড়িয়ে নিচ্ছে।
  • অনলাইন ডেস্ক | ২৪ আগস্ট, ২০২৫
গাজায় ফিলিস্তিনিদের হতাশা খাবারের জন্য লাইন।

ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিরা ভাতের জন্য শনিবার গাজার একটি দাতব্য রান্নাঘরে হাঁড়ি ও প্লাস্টিকের বালতি হাতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। এর একদিন আগে যুদ্ধবিধ্বস্ত এ ভূখণ্ডে জাতিসংঘ দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করে। গাজা থেকে এএফপি এই খবর জানায়।


এএফপির ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, নারী ও শিশুরা ভিড় করে খাবারের জন্য চিৎকার-চেঁচামেচি করছে। ইসরায়েল এই শহরকেই তাদের সম্প্রসারিত সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে দখলের পরিকল্পনা করছে। ভিডিওতে আরো দেখা যায়, এক কিশোর বড় একটি হাঁড়ির ভেতরে হাত ঢুকিয়ে কিছু অবশিষ্ট ভাত কুড়িয়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে, এক কিশোরী তাঁবুর পাশে বসে মাটিতে রাখা প্লাস্টিকের ব্যাগ থেকে ভাত খাচ্ছে।


গাজার উত্তরের শহর বেইত হানুন থেকে বাস্তুচ্যুত ইউসুফ হামাদ (৫৮) বলেন, ‘আমাদের ঘর নেই, খাবার নেই, আয় নেই। তাই বাধ্য হয়ে দাতব্য রান্নাঘরে এসেছি। কিন্তু এগুলোও আমাদের ক্ষুধা মেটাতে পারছে না।’ গাজার দক্ষিণে দেইর আল-বালাহর এক দাতব্য রান্নাঘরে ৩৪ বছরের উম্মে মোহাম্মদ জানান, জাতিসংঘের দুর্ভিক্ষ ঘোষণা ‘অনেক দেরি করে এসেছে।’ তিনি বলেন, ‘শিশুরা খাবার ও পানির অভাবে মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছে। এমনকি ঘুম থেকেও তাদের জাগানো যাচ্ছে না।’


জাতিসংঘ শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে গাজায় দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করেছে। সংস্থাটি  বলেছে, টানা ২২ মাসের যুদ্ধে ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে গাজায় ত্রাণ সহায়তা ঢুকতে না দেওয়ায় সেখানে দুর্ভিক্ষ হয়েছে। রোম ভিত্তিক ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন ইনিশিয়েটিভ (আইপিসিসি) জানায়, গাজা উপত্যকার প্রায় ৫ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের সঙ্গে লড়াই করছে। এ অঞ্চল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ, যেখানে গাজা শহরও অন্তর্ভুক্ত আছে।


ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এই প্রতিবেদনকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন। 


শনিবার জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার প্রধান বলেন, ‘ইসরাইল সরকারের গাজায় সৃষ্ট দুর্ভিক্ষকে অস্বীকার করা বন্ধ করা উচিত।’ জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ-এর প্রধান ফিলিপ লাজারিনি এক্স-এর এক পোস্টে বলেন, ‘যাদের প্রভাব আছে, অবশ্যই তাদের সবাইকে তা দৃঢ়তা ও নৈতিক দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রয়োগ করতে হবে।’ আইপিসি ধারণা করছে, সেপ্টেম্বরে শেষ নাগাদ দুর্ভিক্ষ দেইর আল-বালাহ ও খান ইউনিসে ছড়িয়ে পড়বে। যা গাজার দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা জুড়ে রয়েছে।


এদিকে ইসরায়েল হামলা ও বোমা বর্ষণ অব্যাহত রেখেছে। এএফপি-র ফুটেজে দেখা গেছে গাজা সিটির জেইতুন এলাকায় ধোঁয়া উড়ছে। ধ্বংসস্তূপে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা। এএফপির ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, গাজার জেইতুন জেলার আকাশে যখন ঘন ধোঁয়া উড়ছে তখন ভবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ফিলিস্তিনিরা কিছু খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।


গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থার মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানান, সাবরা ও জেইতুন এলাকার অবস্থা ‘একেবারেই ভয়াবহ’। তার ভাষায়, ‘সেখানে পুরো আবাসিক ব্লক মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।’ জেইতুনের উত্তর প্রান্তে বাস্তুচ্যুত আহমাদ জুনদিয়েহ (৩৫) বলেন, ‘আমরা এখানে আটকে আছি, ভয়ে বাস করছি। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। গাজায় কোথাও নিরাপত্তা নেই। এখন চলাফেরা করা মানেই মৃত্যু।’ তিনি এএফপিকে ফোনে বলেন, ‘আমরা সবসময় বোমা ফাটার শব্দ শুনি, যুদ্ধবিমান, কামানের গোলা এবং এমনকি ড্রোন বিস্ফোরণের শব্দও শুনতে পাই। আমরা ভীষণ আতঙ্কিত, মনে হচ্ছে শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে।’


ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ শুক্রবার হুঁশিয়ারি দেন, হামাস যদি নিরস্ত্র না হয়, জিম্মিদের মুক্তি না দেয় এবং ইসরায়েলের শর্তে যুদ্ধ শেষ না করে, তবে তারা গাজা ধ্বংস করে দিবে। গাজার বাসিন্দারা জানান, এই এলাকায় গত কয়েক দিন ধরে হামলা অবিরামভাবে চলছে।


গাজার বাসিন্দা ৫৩ বছর বয়সী আইমেন দালুল, যার বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে, তিনি বলেন, ‘ওরা আসুক আর নিজের চোখে দেখুক জেইতুনে কী ঘটছে। আমরা ধ্বংস হয়ে গেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘দরকারে আমরা গবাদিপশুর মতো রাস্তায় ঘুমাব তবু আমাদের প্রতি দয়া করুন।’


২৪ বছর বয়সী মাহমুদ আবু সাকের বলেন, ইসরায়েল গাজা দখলের পরিকল্পনা ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই লোকজন দ্রুত এলাকা ছাড়ছে। তিনি বলেন, ‘আজ সকালে ৫০০ থেকে ৬০০ এর বেশি পরিবার চলে গেছে এবং গতকাল হাজার হাজার মানুষ চলে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সকাল থেকে বিস্ফোরণের শব্দ সবাইকে পালাতে বাধ্য করছে।’


সূত্র: এএফপি


এসজেড