প্রায় দুই দশক চলা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের পাশে কাজ করা আফগানদের এক সময় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তালেবানের চরমপন্থী দমননীতি থেকে রক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রেই তারা আশ্রয় পাবে। কিন্তু গত মাসে ওয়াশিংটনে ন্যাশনাল গার্ডের দুই সেনা সদস্যকে গুলি করা হয়। এই হামলায় একজন সেনা প্রাণ হারায় এবং এই হামলাকারী একজন আফগান নাগরিক বলে অভিযোগ রয়েছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
এরপর থেকে আফগানদের যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় দেওয়ার সেই প্রতিশ্রুতির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। অনেক আফগানই ভয় পাচ্ছেন। সামনে তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে, তা নিয়ে তারা শঙ্কিত। ৩১ বছর বয়সী এক আফগান গ্রিনকার্ডধারী মরিয়ম এএফপিকে বলেন, ‘সবাই আতঙ্কিত। আমরা ভয় পাচ্ছি, একজন আফগানের অপরাধের দায়ে সবার বিচার করা হবে।’
ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ন্যাশনাল গার্ডের স্পেশালিস্ট সারাহ বেকস্ট্রম (২০) তথাকথিত ওই ‘অ্যামবুশ-ধাঁচের’ হামলায় গুরুতর আহত হয়ে মারা যান। একই ঘটনায় তার সহকর্মী গার্ডসম্যান অ্যান্ড্রু উলফ (২৪) গুরুতর আহত হয়ে জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
পরদিনই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আফগানিস্তানসহ ‘তৃতীয় বিশ্বের সব দেশের’ নাগরিকের সব ধরনের অভিবাসন স্থগিত করছেন। একই সঙ্গে ট্রাম্প তার প্রশাসন ১৯টি দেশের নাগরিকদের দেওয়া আবাসিক অনুমতির বিষয়টি পুনর্বিবেচনাও শুরু করেন। এএফপি’র হিসাব অনুযায়ী এতে প্রায় ১৬ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এতে করে আফগানদের আশঙ্কা, তাদের আবার সেই দেশে (আফগানিস্তানে) পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে, যেটি এখন সেই ইসলামপন্থী তালেবানদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যাদের পরাজিত করতে তারা এক সময় কাজ করেছেন।
মরিয়ম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রতেই আমার ঘর বানিয়েছি এবং এখন এটাই আমার বাড়ি। এখান থেকে এখন আমি কোথায় যাব?’ যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্তৃপক্ষকে ক্ষুব্ধ করার আশঙ্কায় এএফপির সঙ্গে কথা বলা সব আফগান নাগরিকের মতোই মরিয়মও পরিচয় গোপন রাখতে চান। তিনি বলেন, ‘ঘুমোতে গেলে বুকের ভেতর কেমন যেন একটা শূন্য লাগে, ব্যথা করে। আমার মনে হয়, আমি কোথাওই নিজের নই।’
২৭ বছর বয়সী মরিয়ম কাবুলে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করেন। তিনি শিক্ষা-সংক্রান্ত উপকরণ তৈরিতে সহায়তা করেন, যেগুলো তার ভাষায় তালেবানকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরত। মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক বাহিনী যখন সেখানে ছিল, তখন আফগানিস্তান আধুনিকায়নের পথে হাঁটতে শুরু করে এবং নারীরা এমন সব অধিকার পায়, যা তাদের মায়েরা কখনও পাননি। মরিয়ম বলেন, ‘পড়াশোনা করেছি। আমার দেশ আর নিজের জন্য বড় স্বপ্ন ছিল।’
কিন্তু ২০২১ সালের আগস্টে শেষ মার্কিন সেনারা তড়িঘড়ি করে আফগানিস্তান ছাড়ার পর তালেবান ফের দেশটির দখল নেয়। মার্কিন কর দাতাদের বিপুল অর্থে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ে। লস অ্যাঞ্জেলেসের বাইরে নিজের বাড়ি থেকে কথাগুলো বলছিলেন মরিয়ম।
পশ্চিমাদের সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া হবে— এই আতঙ্কে শত শত হাজার আফগান ওই সময়ে দেশ ছাড়তে মরিয়া হয়ে ওঠেন। খান নামের অপর এক ব্যক্তি বলেন, ‘বিমানবন্দরে ঢোকাই ছিল ভীষণ কঠিন।’ তার নিজের স্ত্রী ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকা একজন মার্কিন নাগরিক, এর প্রমাণসহ ডজনখানেক নথি ছাপিয়ে নিয়ে যান তিনি।
খান বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি ছিল না, খাবার ছিল না, কিছুই না। চার দিন আমরা সেখানে ছিলাম। ওই সময়ে রাতে প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়ত।’ বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি সরকারি ব্যাংকে কাজ করা খান শেষ পর্যন্ত কাতার হয়ে জার্মানি যান এবং সেখান থেকে নিউ জার্সিতে পৌঁছান। সেখানে দুই মাস ধরে তার পটভূমি যাচাই ও অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
তিনি বলেন, ‘আমরা সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কৃতজ্ঞ। তারা আমাদের এখানে আসতে সাহায্য করেছে এবং নতুন করে জীবন গড়তে সুযোগ দিয়েছে।’ খান জানান, ক্যালিফোর্নিয়ার আনাহেইমে তিনি দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন, কখনও একসঙ্গে দুইটি কাজও করেছেন। এখন তার নিজের একটি পুরনো গাড়ির ডিলারশিপ আছে।
তিনি একটি ট্রিপ্লেক্স বাড়িও কিনেছেন, যার একটি অংশ ভাড়া দিয়ে আয় করেন। স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য তিনি গ্রিনকার্ডও পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ডিসেম্বরের শেষ দিকে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার কথা ছিল। কিন্তু ওয়াশিংটন ডিসির ঘটনার পর দুর্ভাগ্যজনকভাবে সবকিছু থেমে গেছে। যাদের গ্রিনকার্ড আছে, প্যারোল স্ট্যাটাস আছে বা আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছে— যে যে অবস্থাতেই থাকুক, এই পরিস্থিতিতে সবাই ভয় পাচ্ছে। আমাদের অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু এখন প্রতিদিন সবকিছু আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে, আর স্বপ্নগুলো যেন উল্টো পথে হাঁটছে।’
অরেঞ্জ কাউন্টিতে একটি এনজিওতে কাজ করা মরিয়মের চাওয়া খুবই সামান্য ও সাধারণ। তিনি চান তার গ্রিনকার্ডের আবেদন যেন আবার এগোয়, আর তার সম্প্রদায়ের সঙ্গে যেন ন্যায্য আচরণ করা হয়। তিনি বলেন, ‘ওয়াশিংটনে যে ব্যক্তি এই কাজটি করেছে, সে আমাদের প্রতিনিধিত্ব করে না। আমরা সবাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আমরা বিশ্বাসঘাতক নই। আমরা বেঁচে যাওয়া মানুষ।’
সূত্র: এএফপি
এসজেড