রায়হান দাবি করেছিল, ঢাকায় একটি চক্র তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করতে তার পা কেটে দেয়। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে জানা গেছে, গত ১১ জুন ট্রেন দুর্ঘটনায় রায়হানের ডান পা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২ জুলাই চিকিৎসকেরা তার পা কেটে ফেলেন।
পুলিশের নথিতেও রায়হানকে কোনো চক্র অপহরণ করে পরিকল্পিতভাবে তার পা কেটে দিয়েছে—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
আজ (১৭ সেপ্টেম্বর) সকালে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা রেলওয়ে পুলিশ জানায়, রায়হানের আলট্রাসনোগ্রাম প্রতিবেদনে তার দুই কিডনিই স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ জানায়, পা কেটে রায়হানকে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়েছে—এমন তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে চিকিৎসা নথি পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়ার পর এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
রায়হানের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের পর তাকে নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। শিশুটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে।
এদিকে হাতে আসা রায়হানের আলট্রাসনোগ্রাম প্রতিবেদনেও তার একটি কিডনি চুরি হয়েছে—এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
চুনতিতে রোববার ভোরে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে স্থানীয়রা রায়হানকে দেখতে পান। খবর পেয়ে তার বাবা সেখানে গিয়ে তাকে শনাক্ত করেন।
রায়হান স্থানীয় একটি মাদ্রাসার হিফজ বিভাগে পড়ত। তার বাবা নাজিম উদ্দিন দিনমজুর। কয়েক বছর আগে তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। এরপর সে সৎমায়ের সঙ্গে থাকত।
রায়হানের আলট্রাসনোগ্রাম প্রতিবেদনে তার দুই কিডনিই স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার বাবা জানান, গত ৯ ফেব্রুয়ারি মাত্র ১০০ টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয় রায়হান। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি। তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়নি।
লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, জিডি না করায় রায়হান নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি পুলিশ জানত না।
রায়হানের ভাষ্য অনুযায়ী, ৯ ফেব্রুয়ারি বাড়ি থেকে বের হয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহৃত একটি ট্রাকে করে লোহাগাড়ার আমিরাবাদে যায় সে। পরে একই ট্রাকে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে যায়। সেখানে পর্যটকদের কাছে টাকা চাইত এবং শরীর মালিশ করে আয় করত। সেই টাকা দিয়ে খাবার কিনত এবং রাতে সৈকতে ঘুমাত।
প্রায় দুই মাস সেখানে থাকার পর একজন ব্যক্তি তাকে বেশি টাকা দেওয়ার কথা বলে ঢাকায় নিয়ে যায় বলে জানায় রায়হান।
তার দাবি, ঢাকায় মীনা ওরফে সালমা নামে একজন নারীর তত্ত্বাবধানে রেলস্টেশনের কাছে একটি কক্ষে থাকত সে। কমলাপুর রেলস্টেশনের আশপাশে পানি ও জুস বিক্রি করে দিনে তিন বেলা খাবার পেত।
প্রায় এক মাস পর একদিন ঘুম থেকে উঠে হাসপাতালে নিজের ডান পা কাটা দেখতে পায় বলে দাবি করে রায়হান। তাকে বলা হয়েছিল, ট্রেনের ধাক্কায় তার পা বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
সুস্থ হওয়ার পর তাকে হুইলচেয়ারে করে কমলাপুর রেলস্টেশনে নিয়ে ভিক্ষা করতে বাধ্য করা হয় এবং ভিক্ষার টাকা একটি চক্র নিয়ে নিত বলেও দাবি করে সে। সেখানে আরও ১০ থেকে ১৫ শিশু ছিল এবং তাদের কয়েকজনেরও অঙ্গহানি হয়েছিল বলে রায়হান দাবি করে।
তবে ঢাকা রেলওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ জুন ট্রেন দুর্ঘটনায় আহত হয় রায়হান। ক্যান্টনমেন্ট থানার পুলিশের টহল দল তাকে আহত অবস্থায় পেয়ে রেলওয়ে পুলিশকে জানায়। পরে তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়।
হাতে আসা চিকিৎসা পরামর্শপত্র অনুযায়ী, ১১ জুন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয় রায়হানকে। সেদিনই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে রেলওয়ে পুলিশের কনস্টেবল রিয়াজ তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে সেখান থেকে তাকে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) নেওয়া হয়।
রেলওয়ে পুলিশ জানায়, রায়হানের জন্য রক্ত, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় চিকিৎসকেরা তার ডান পা পর্যবেক্ষণে রাখেন। পরে মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২ জুলাই পা কেটে ফেলা হয়।
হাতে আসা নথিতেও দেখা গেছে, ১১ জুন আহত হওয়ার পর রায়হানকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং প্রায় তিন সপ্তাহ চিকিৎসার পর তার পা কেটে ফেলা হয়। পাওয়া ছবিতে দুর্ঘটনার পর অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে হাসপাতালে নেওয়া এবং রক্তমাখা ব্যান্ডেজে ডান পা বাঁধা অবস্থায় চিকিৎসা নেওয়ার দৃশ্য দেখা যায়।
পুলিশ জানায়, সমাজসেবা অধিদপ্তর নিটোরের সহকারী হিসেবে কর্মরত ৭০ বছর বয়সী আলেশা বেগমকে রায়হানের দেখাশোনার দায়িত্ব দেয়। প্রায় দেড় মাস তিনি হাসপাতালে রায়হানের সঙ্গে ছিলেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ১১ জুনের দুর্ঘটনার আগে রায়হান 'মালির মা' ওরফে ঝর্ণা নামে পরিচিত একজন নারীর সঙ্গে থাকত এবং স্টেশন এলাকায় পানি বিক্রি করত। চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়ার পরও সে ঝর্ণার সঙ্গে ছিল এবং পরে ভিক্ষা শুরু করে।
রায়হানের দাবি, মীনা ওরফে সালমা তাকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে বাসে কক্সবাজার পাঠায়। সেখান থেকে সে চুনতিতে যায়। তবে পুলিশ বলছে, মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে ১২ সেপ্টেম্বর বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নেয় রায়হান। তার সমবয়সী বন্ধু জাকির তাকে একটি গাড়িতে তুলে দেয়। সেখান থেকেই বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে সে।
পুলিশ আরও জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মীনা বা সালমা নামে যে নারীর কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে রায়হানের কথিত পাচার বা পা কাটার ঘটনার কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।
ঢাকা রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জয়নাল আবেদীন টিবিএসকে বলেন, রায়হান ও তার বাবার বক্তব্যের ভিত্তিতে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে তাকে পাচার বা কোনো অপরাধী চক্রের হাতে পড়ার খবর ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তার ভাষ্য, এসব প্রতিবেদন জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
পুলিশ জানায়, পারিবারিক বিরোধের পর প্রায় সাত থেকে আট মাস আগে ঢাকায় আসে রায়হান। এরপর কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকায় থাকত। নগরীর প্ল্যাটফর্ম এলাকায় লিডো এনজিও পরিচালিত পথশিশুদের একটি স্কুলে নিয়মিত যেত এবং সেখানে দুপুরের খাবার খেত।
চিকিৎসা শেষে রায়হান আবারও কমলাপুর রেলস্টেশনের নগর প্ল্যাটফর্ম এলাকায় অবস্থান করছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের পর রায়হানকে নিরাপদে তাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। শিশুটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে।
thebgbd.com/BYB