প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নিয়ম ভঙ্গের ১১৫টি অভিযোগ ছিল ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে। দুই বছরেরও বেশি সময় শুনানির পর ১১৪টিতেই তারা দোষী সাব্যস্ত হয়েছে বলে বিস্ফোরক খবর জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য অ্যাথলেটিক’। তবে এখনও রায় আসেনি। এখন প্রশ্ন উঠেছে– নিয়ম ভঙ্গের মৌসুমে সিটির জেতা শিরোপাগুলোর কী হবে? প্রিমিয়ার লিগে তাদের অবস্থানের ওপর কী প্রভাব পড়বে? তারা কি আপিল করবে?
এ ছাড়াও দীর্ঘ এই আইনি অধ্যায় পুরোপুরি শেষ হতে কত সময় লাগবে– সেটাও এখন বড় প্রশ্ন। চার বছর তদন্তের পর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর শুরু হয় এই মামলার শুনানি। সামনে আরও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া অপেক্ষা করছে বলে ধারণা করছে গণমাধ্যম।
১১৫টি অভিযোগ কী?
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় এবং একটি স্বাধীন কমিশনের কাছে বিষয়টি পাঠানো হয়। এসব অভিযোগ ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সংঘটিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল।
প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নিয়মসংক্রান্ত অভিযোগগুলো হলো—
# ৫৪টি– ২০০৯-১০ থেকে ২০১৭-১৮ মৌসুম পর্যন্ত সঠিক আর্থিক তথ্য দিতে ব্যর্থতা।
# ১৪টি– ২০০৯-১০ থেকে ২০১৭-১৮ মৌসুম পর্যন্ত খেলোয়াড় ও ম্যানেজারদের অর্থপ্রদানের সঠিক তথ্য দিতে ব্যর্থতা।
# ৫টি– ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৭-১৮ পর্যন্ত উয়েফার নিয়মে থাকা আর্থিক ফেয়ার প্লে (এফএফপি) অনুসরণ না করা।
# ৭টি– ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৭-১৮ পর্যন্ত প্রিমিয়ার লিগের প্রফিট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি রুলস (পিএসআর) ভঙ্গ।
#৩৫টি– ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রিমিয়ার লিগের তদন্তে অসহযোগিতা।
বিজ্ঞাপন
যদিও সিটি বরাবরই কোনো ধরনের অন্যায়ে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় এলে ক্লাবটি আপিল করবে বলে বিবিসি স্পোর্টকে জানিয়েছে।
এসব অভিযোগের নেপথ্যে যা আছে
২০০৮ সালে সিটি আবুধাবির মালিকানায় যাওয়ার পরের কয়েকটি মৌসুমের বিভিন্ন নথি ও ই-মেইল ফাঁস করে জার্মান সংবাদমাধ্যম ডের স্পিগেল। এসব নথির মধ্যে সিটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের পাঠানো বলে দাবি করা ই-মেইলও ছিল। তাদের কয়েকজন এখনও সিটি ফুটবল গ্রুপে রয়েছেন।
ডের স্পিগেলের প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিমান সংস্থা ইতিহাদ এবং রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান ইতিসালাতের স্পন্সরশিপ আয় বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, সিটির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান শেখ মনসুরের আবুধাবি ইউনাইটেড গ্রুপের সরাসরি বিনিয়োগকে স্পন্সরশিপ আয় হিসেবে দেখাতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর হিসাবের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করা হয়েছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, উয়েফার ২০১১ সালে চালু করা আর্থিক ফেয়ার প্লে এবং ২০১২ সালে প্রিমিয়ার লিগে চালু হওয়া প্রফিট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি নিয়মের অধীনে ক্লাবগুলোর অনুমোদিত লোকসানের সীমা পূরণ করার জন্য এমনটি করা হয়েছিল। এরপর আর্থিক তথ্য ভুলভাবে উপস্থাপনের আরও অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে এমন কিছু নথিও ছিল, যেখানে দাবি করা হয়– তৎকালীন ম্যানেজার রবার্তো মানচিনিকে আবুধাবির একটি ক্লাব থেকে কনসালটেন্সি ফি হিসেবে গোপনে বা ‘অফ-দ্য-বুকস’ অর্থ দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া খেলোয়াড়দের সরকারি হিসাবের মাধ্যমে প্রদর্শিত অর্থের চেয়ে বেশি অর্থ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে ক্লাবের হিসাব অনুযায়ী ব্যয় প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে কম দেখানো সম্ভব হয়। যদিও সিটি বরাবরই আবুধাবি ইউনাইটেড গ্রুপ রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এবং বেসরকারি তহবিল বলে দাবি করে আসছিল। আবার, ডের স্পিগেলের প্রকাশিত তথ্য নিয়ে ক্লাবটি কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের দাবি ছিল, ফাঁস হওয়া ই-মেইল অবৈধভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং এগুলো ছিল ‘ক্লাবের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা’।
অভিযুক্ত সময়ে সিটি যেসব শিরোপা জিতেছে
সিটির বিরুদ্ধে ওঠা বেশির ভাগ অভিযোগের সময়কাল ২০০৯–১০ থেকে ২০১৭–১৮ মৌসুম পর্যন্ত। এ সময়ে ক্লাবটি জিতেছে তিনটি প্রিমিয়ার লিগ (২০১১–১২, ১৩–১৪, ১৭–১৮), তিনটি লিগ কাপ (২০১৩–১৪, ১৫–১৬ ও ১৭–১৮) এবং দুটি এফএ কাপ (২০১০–১১ ও ১৭–১৮)। অর্থাৎ অভিযোগের সময়কালে সিটির শোকেসে উঠেছে মোট আটটি বড় ঘরোয়া ট্রফি।
যে শাস্তি হতে পারে ম্যানচেস্টার সিটির
রায় হলেও অবশ্য সিটির ভাগ্যে কী শাস্তি জুটবে সেটি জানতে আরও অপেক্ষা করতে হবে। স্বাধীন প্যানেল আনুষ্ঠানিকভাবে রায় প্রকাশ করবে। এখনও অবশ্য মামলাটি শুনে রায় দেওয়া প্যানেলে কারা ছিলেন, সেটিও জানা যায়নি। লিখিত রায় প্রকাশের পরই সেসব সামনে আসবে।
শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা কমিশনের সামনে সব ধরনের বিকল্পই খোলা রয়েছে–
পয়েন্ট কেটে নেওয়া (তাৎক্ষণিকভাবে অথবা স্থগিত শাস্তি হিসেবে)
আর্থিক জরিমানা (তাৎক্ষণিকভাবে অথবা স্থগিত শাস্তি হিসেবে)
প্রিমিয়ার লিগ থেকে বহিষ্কার
প্রিমিয়ার লিগ থেকে বহিষ্কার করা হলে সিটি তাদের লিগ সদস্যপদ হারাবে এবং মৌসুম শেষে নিচের কোনো বিভাগে অবনমিত হবে। এমনকি এত বড় অঙ্কের পয়েন্ট কেটে নেওয়া হতে পারে যে কার্যত সেটিই সিটির অবনমন নিশ্চিত করবে। আবার, সিটির অভিযোগভুক্ত অপরাধের কারণে যেসব ক্লাব লিগে তাদের অবস্থানে পিছিয়ে আছে, তারা সম্ভাব্য শিরোপা জেতার সুযোগ হারানোর কারণে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে। তবে এ ধরনের দাবিগুলো পৃথকভাবে একটি স্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে শুনতে হবে।
চলতি বছরের শুরুতে এভারটনকে বলা হয়, প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নিয়ম ভঙ্গের প্রভাবের কারণে বার্নলিকে ৩ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড দিতে হবে। মামলাটি প্রিমিয়ার লিগের একটি কমিশনে শুনানি হয়েছিল। বিষয়টি ২০২১-২২ মৌসুমের, যখন তিন বছর মেয়াদি সময়ে প্রফিট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি রেগুলেশনস ভঙ্গের দায়ে এভারটনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। শাস্তি হিসেবে বার্নলিকে ২ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড ক্ষতিপূরণ এবং আরও ৯০ লাখ পাউন্ড সুদ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় এভারটনকে।
thebgbd.com/NIT