ঢাকা | বঙ্গাব্দ

তেলাপোকা পার্টির কাছে হারলো মোদির বিজেপি

  • অনলাইন ডেস্ক | ২১ মে, ২০২৬
তেলাপোকা পার্টির কাছে হারলো মোদির বিজেপি ফাইল ছবি

রাজনীতি, মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের মতো গুরুতর বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে হালকা রসিকতার মোড়কে আলোচনা করে ভারতে ঝড় তুলেছে মাত্র পাঁচ দিন আগে তৈরি হওয়া একটি অনলাইন গ্রুপ। জেন জি প্রজন্মের তরুণদের উদ্বেগ আর অধিকার আদায়ের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা এই গ্রুপটির ফলোয়ার সংখ্যা ইতোমধ্যে ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টকে ছাড়িয়ে গেছে।

নিজেদের বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে দাবি করা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিজেপির ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার সংখ্যা ৯০ লাখের কিছু কম। কিন্তু মাত্র এক সপ্তাহেরও কম সময়ে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের এই গ্রুপটি ইনস্টাগ্রামে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ফলোয়ারের বিশাল মাইলফলক স্পর্শ করেছে।

মোবাইল ফোনের ওপর একটি তেলাপোকার অবয়বকে লোগো হিসেবে ব্যবহার করা সিজেপি নিজেদের ‘অলস এবং বেকারদের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে।

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গ্রুপটির ৩০ বছর বয়সী প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে বলেন, গত সপ্তাহে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এক মন্তব্যে কিছু বেকার যুবককে তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। সেই মন্তব্য থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে গ্রুপটির নাম রাখা হয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।

অবশ্য পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্পষ্ট করে বলেছিলেন, তিনি যুবসমাজকে খাটো করতে চাননি, বরং ‘ভুয়া ও জাল সনদধারী’ তরুণদের বুঝিয়েছেন; যারা মূলত ‘পরজীবী’।


গত দুই বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে বসবাস করছেন ভারতীয় নাগরিক দিপকে। সেখান থেকেই তিনি বলেন, ‘‘এটি ভারতের রাজনৈতিক ধারণাকে বদলে দেওয়ার একটি আন্দোলন। ভারতের তরুণ সমাজ মূলধারার রাজনৈতিক আলোচনা থেকে অনেকটাই হারিয়ে গেছে। আমাদের নিয়ে কেউ কথা বলছে না। কেউ আমাদের সমস্যাগুলো শুনছে না। এমনকি আমাদের অস্তিত্বকে স্বীকার করারও কোনও চেষ্টা নেই।’’

সিজেপির ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে দলটির সদস্যদের তৈরি বিভিন্ন গ্রাফিক্স ও ভিডিও প্রকাশ করা হচ্ছে। যেখানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে সংসদ ও মন্ত্রিসভার অর্ধেক আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখার মতো নানা বিষয় নিয়ে কথা বলা হচ্ছে।

এমনকি সম্প্রতি প্রশ্ন ফাঁসের কারণে প্রায় ২৩ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ সংকটে ফেলা জাতীয় মেডিকেল কলেজ ভর্তি পরীক্ষা বাতিলের ঘটনাটিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে গ্রুপটি।

ভারতের তরুণদের মধ্যে জমে থাকা এই তীব্র ক্ষোভ ও অস্থিরতার প্রতিফলন ঘটেছে চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত ডেলয়েট গ্লোবালের এক জরিপেও। জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে, ১৯৯৫ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া ভারতের জেন জি প্রজন্ম কর্মসংস্থানের অভাব এবং উচ্চ মূল্যের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

জরিপে বলা হয়েছে, ‘‘জেন জি তরুণ-তরুণরা তীব্র আর্থিক মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের একটি বড় অংশই আবাসন সমস্যা এবং আর্থিক নিরাপত্তাহীনতার চ্যালেঞ্জগুলোকে প্রধান সংকট হিসেবে উল্লেখ করেছেন।’’’

• বড় সিদ্ধান্তে পিছিয়ে যাচ্ছে জেন জি প্রজন্ম
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বের বৃহত্তম যুবশক্তির দেশও ভারত। দেশটির ১৪২ কোটি জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশেরই বয়স ৩৫ বছরের নিচে। ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ২০২৫ সালে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ৩ দশমিক ১ শতাংশ। তবে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল অনেক বেশি; যা প্রায় ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। এর মধ্যে শহরাঞ্চলে এই বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ।

দেশটির বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশাল তথ্যপ্রযুক্তি সেবা খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যেভাবে প্রাথমিক স্তরের চাকরিগুলো দখল করছে, তাতে এই বেকারত্ব সমস্যা আরও প্রকট হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তরুণরা।

ডেলয়েটের জরিপে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তার কারণে ৫৪ শতাংশ জেন জি এবং ৪৪ শতাংশ মিলেনিয়াল (যাদের জন্ম ১৯৮৩ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে) তরুণ বাড়ি কেনার মতো জীবনের বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো পিছিয়ে দিচ্ছেন। ১৪ হাজারেরও বেশি মানুষের ওপর চালানো এই জরিপে দেখা গেছে, বেকারত্বই তরুণদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ।

তবে প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও নেপালে জেন জি প্রজন্মের নেতৃত্বে হওয়া গণ-আন্দোলনের সঙ্গে সিজেপির তুলনা করার বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন দিপকে। বাংলাদেশ ও নেপালে জেন-জি আন্দোলনে সরকারের পতন ঘটেছিল। তবে জেন জি প্রজন্ম নিয়ে সরাসরি কোনও রাজনৈতিক দল গঠনের পরিকল্পনা আছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি তিনি।

দিপকে বলেন, ‘‘এই উদ্যোগের মাঝে বড় রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেওয়ার এবং ভারতের রাজনীতিকে বদলে দেওয়ার সব ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আমরা যাই করি না কেন, তা দেশের সংবিধানের পরিধির মধ্যে থেকেই করব। আমরা অত্যন্ত গণতান্ত্রিক এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে এগোব। নেপাল বা বাংলাদেশে আমরা যা দেখেছি, এটি তেমন কিছু হবে না।’’

সিজেপির এই প্রতিষ্ঠাতা বলেন, ইতোমধ্যে গুগলের একটি ফর্মের মাধ্যমে চার লাখের বেশি মানুষ সিজেপির সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করেছেন; যার মধ্যে ৭০ শতাংশেরই বয়স ১৯ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে।

সিজেপির সদস্য হওয়ার জন্য চারটি অদ্ভুত শর্ত দেওয়া হয়েছে। আবেদনকারীকে অবশ্যই বেকার, অলস, সার্বক্ষণিক ইন্টারনেটে সক্রিয় এবং পেশাদার ভঙ্গিতে ক্ষোভ প্রকাশে পারদর্শী হতে হবে।

উত্তরাঞ্চলীয় শহর লখনউয়ের ২৬ বছর বয়সী তরুণ সিদ্ধার্থ কনৌজিয়া সিজেপির সদস্য হওয়ার জন্য নাম লিখিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘আমি ককরোচ জনতা পার্টিকে সত্যিই খুব পছন্দ করি। কারণ এই দেশে তরুণদের কথা শোনার কেউ নেই এবং যুবসমাজের জন্য পর্যাপ্ত চাকরিও নেই।’’

তিনি বলেন, ‘‘তবে এই দলটি তরুণদের স্বার্থ নিয়ে কথা বলছে এবং সঠিক সমস্যাগুলো সামনে নিয়ে আসছে। তেলাপোকা মূলত টিকে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক, যা যেকোনো বড় ধাক্কা বা চ্যালেঞ্জের পর আবারও শক্তিশালীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।’’

সূত্র: রয়টার্স।

thebgbd.com/NIT